লন্ডনের জীবন অনেকটা দিল্লির লাড্ডুর মতো। যে এসেছে, সে মায়ায় জড়িয়ে গেছে। যে আসেনি, সে আসার জন্য উদগ্রীব। সেদিন এক বন্ধু বেড়াতে এল কানাডার মন্ট্রিল থেকে। সে নিজের মেয়ের জন্য খুঁজছে একটা নিরাপদ শহর। দুবাই, সিঙ্গাপুর ঘুরে শেষে এল লন্ডনে। বলল, “এটাই সবচেয়ে নিরাপদ।”
কারণ? নানা ভাষা, নানা সংস্কৃতির রঙ-বেরঙের মানুষ, মাঝরাত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ায়, নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে, নিজ গন্তব্যে ছুটে চলে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তুই কি আসবি?” সে বলল, “সম্ভাবনা আছে।”
আর এই শহরটাতেই, আমি দেড় যুগ ধরে আছি। যা এখন আমার পরিচয়ের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রমশ এখানে বাংলাদেশের মানুষের আনাগোণার হার ও সংখ্যা দুটোই বাড়ছে। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও নৈকট্য বাড়াতে দেশের সকল ধরণের উৎসব সমারোহে পালন করা হয়। উপলক্ষ যেমন প্রবাসী বাংলাদেশীদের একত্র করা, তেমনই নিজের দেশের আবহকে উৎযাপন করা।
নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি কে নতুন প্রজন্ম ও বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য উৎসবের আয়জনে কোনো খামতি আমরা রাখি না। পহেলা বৈশাখ, সংক্রান্তি, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, ঈদ, দূর্গাপূজা, পিঠামেলা, বইমেলা-সহ আরো অনেক ধরনের লোকজ উৎসব সারা বছর ধরেই লন্ডনে পালিত হয়। লন্ডনের বুকে গড়ে উঠেছে এক ক্ষুদ্র বাংলাদেশ। যেখানে বাংলাদেশিরা একত্রিত হয়, দেশের গল্প করে, শিকড় খোঁজে, সংস্কৃতির আলোয় নিজেদের আলো দিতে থাকে।
এই শহরে আমাদের বিস্তৃত কমিউনিটির মানুষেরা আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়াই, আলপনা আঁকি, পিঠা বানাই, আর হৃদয়ের ভেতর বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখি।
একসময় ভাবতাম, পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে যাব। কিন্তু সন্তানেরা এখানে বড় হলো, স্কুলে যেতে শুরু করল। তখন দেখলাম—এখানকার স্কুলে নেই অসুস্থ কোনো প্রতিযোগিতা। শিক্ষকেরা ছাত্র-ছাত্রীদেরকে উৎসাহ দেয়, প্রশংসা করে, নতুন সব বিষয়ে কৌতুহল জাগায়, ব্যর্থ হলে হাতে ধরে শেখায়। এখানে ফার্স্ট-সেকেন্ডের ব্যাপার নেই! এমনকি, মানুষের প্রতি সমান, সহানুভূতির উপস্থিতিও খুবই প্রাত্যাহিক বিষয় এখানে।
একবার আমি বেশ অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। বড় মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে যেতে পারছি না। তার আইরিশ ক্লাস টিচার বললেন,“চিন্তা করোনা। আমি ওকে বাসায় দিয়ে আসব, যদি তুমি কিছু মনে না করো।” শুনে খুব অবাক হলাম। এ যুগে এমন শিক্ষকও আছে! এর পরের দুই দিন ধরে সত্যিই সে মেয়েকে পৌঁছে দিল, আমার খবর নিল, আমাকে সাহস দিল। কি দারুন মহানুভবতা! এই হচ্ছে লন্ডন; যেখানে ধর্ম, বর্ণ, গায়ের রঙ—কিছুই মুখ্য নয়। সবার আসল পরিচয় মানুষ। এই শহরে কেউ কারও খবরা-খবর জানার প্রয়োজন মনে করেনা, তবু প্রয়োজনে ঠিক পাশে দাঁড়ায়। এখানে মানুষ সুযোগ পেলেই দেশের রাজনীতি নিয়ে গল্প করতে বসেনা, কিন্তু নেতাদের ভুল ধরতে কখনো কালক্ষেপণ করেনা।
আর ছুটিতে আমরা বাংলাদেশিরা দুই জন একসাথে হলে দেশের রাজনীতি নিয়ে আলাপ করি, দেশকে নিয়ে চিন্তায় শেষ হই। আবার, সোমবার হলে ঠিক অফিসে গিয়ে সব ভুলে যাই। সোমবার থেকে আবার আমরা ব্রিটিশ। সপ্তাহান্তে শনিবারে গিয়ে আবার বাংলাদেশি হই।
এই দ্বৈত পরিচয় আমাদের জীবনের অংশ। একদিকে পেশাদার জীবন, অন্যদিকে হৃদয়ের টান।
একটা সময় ছিল যখন দিন গুনতাম, কখন দেশে ফিরে যাব। কখন মা, বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাবো। রিকশায় উঠবো, যান্ত্রিক জীবন থেকে দূরে চলে যাব। পরবর্তীতে, কর্মস্থলে যোগদানের পর মনে হলে যে, সবাই মানিয়ে চলতে পারলে আমি কেন পারবোনা! আর এখানের যাতায়াত ব্যবস্থা কত চমৎকার! আগে থেকে পরিকল্পনা করে সময়মতো কাজে যাওয়া যায়। বাচ্চারা একা একা পড়ছে। বড় মেয়েটি ক্লাস টেনে, ছোটটি প্রাইমারিতে—দুজনেই টিউটর ছাড়াই হোমওয়ার্ক করে, স্কুল থেকে সার্টিফিকেট পায়।
এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মূল্যায়ন হয় নিয়মিত। ছাত্র-ছাত্রীরা ফিডব্যাক দেয়, শিক্ষার মান বাড়ে। আমি শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করার পর এতবেশি ইতিবাচক ফিডব্যাক পেয়েছি যে নিজেকে সার্থক মনে হয়।
একসময় শুন্যতা আর দমবন্ধ অনুভূতিতে নিজের ভারি সার্টিফিকেটগুলোকে অপ্রয়োজনীয় মনে হতো। আর আজ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে চিনেছি নতুন করে। আবিষ্কার করলাম নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে। ছোট ছোট ঘটনা আমাকে শিখিয়েছে—স্বপ্ন দেখতে, পরিশ্রম করতে, আর অর্জন করতে।
লন্ডন এমনই এক অদ্ভুত শহর। সবাইকে দুই হাত ভরে দেয়। যে যা চায়, যেভাবে চায়, সেভাবেই দেয়। এ এক মায়া, আর আমি তার বন্ধনে আছি। আমার মতো আরও অনেকেই আছে, এই শহরে, এই একই মায়ার টানে।